গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না থাকলে মানবাধিকার থাকে না: মঞ্জুর হোসেন ঈসা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না থাকলে মানবাধিকার থাকে না: মঞ্জুর হোসেন ঈসা
Spread the love

সমতা, ন্যায় বিচার এবং মানুষের জন্য দাড়াই এই স্লোগানকে সামনে রেখে ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ রবিবার ৭০তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। যেই মূহুর্তে এবার মানবাধিকার দিবস পালন করা হচ্ছে ঠিক সেই মূহুর্তে বিশ্বসহ বাংলাদেশে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে ১০ লক্ষাধিক নারী শিশু রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ব্যাপারে বিশ্বের বিবেক যেন নিস্তব্ধ নিরব হয়ে রয়েছে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রের প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানবতার মা হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। অথচ এখনও মানবতা ধুমড়ে মুরছে কাঁদছে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ জীবন আরো অনিশ্চিত ও অন্ধকারে ধাপিত হচ্ছে, অন্য দিকে বাংলাদেশ নতুন করে ১০ লক্ষ মানুষের অনাকাঙ্খিত বুঝা বহন করতে হবে। বাংলাদেশে এখন মানবাধিকার শূন্য কোটায়। রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ি থেকে শুরু করে শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং বিরোধী দলের পক্ষে যারা কথা বলেন তাদের অনেককেই গুম করা হয়েছে। যা অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপদজনক একটি সংবাদ। প্রতিবছর গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা প্রেসক্লাব সহ বিভিন্ন প্রাঙ্গনে তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সাংবাদিক সম্মলেন সহ নানা কর্মসূচী পালন করছে। অতচ হাতে গুনা কয়েকজন গুম হওয়া সদস্য তাদের পরিবারের কাছে ফিরে এলেও অধিকাংশই এখনও নিখোঁজ রয়েছে। ক্রস ফায়ারের নামেও অনেককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নারী নির্যাতন, শিশু হত্যা, নারী হত্যা এবং সংখ্যালঘুদের উপর নির্বিচারে অত্যাচার ও তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানবতাকে শূণ্য কোটায় এনে ফেলেছে। আমরা মানবাধিকার বলতে কি বুঝি? মানবাধিকার বলতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষা, ভাষা, রাজনৈতিক বা অন্যবিধ মতামত, জাতীয় বা সমাজিক উৎপত্তি, জন্ম, সম্পত্তি বা অন্য কোনো মর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান অধিকার থাকাকে বোঝায়। মানবাধিকারের আক্ষরিক অর্থ হলো মানুষের অধিকার। সাধারণত মানবাধিকার বলতে মানুষের ওইসব অধিকারকে বোঝায় যা নিয়ে সে জন্মগ্রহণ করেন, যা তাকে বিশিষ্টতা দান করে এবং যা হরণ করলে সে আর মানুষ থাকে না। অর্থাৎ মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যেসব অধিকার দরকার সেটিই মানবাধিকার। মানবাধিকার এসব অধিকারকে নির্দেশ করে যা স্বাভাবিক ও সহজাত। মানবাধিকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এবং সামাজিক জীব হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য।

 

মানবাধিকার একটি সহজাত বিষয় যা মানুষ জন্ম নেয়ার সূত্রেই দাবি করতে পারে। মানবাধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদাকে সম্মান প্রদর্শনেই নিহিত। মানবাধিকার ব্যক্তিকে স্বাধীনতা, সমতা ও মর্যাদা নিশ্চিত জীব করে ক্ষমতা দিয়ে থাকে। মানবাধিকার হলো কিছু সুযোগ-সুবিধা যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সবার জন্য সমান। তা ব্যক্তির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহায়ক।

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর ৫১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ। এর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৯২। এটি প্রতিষ্ঠার সময়ই তৈরি করা হয় জাতিসঙ্ঘের সংবিধান। তা টঘ ঈযধৎঃবৎ বা জাতিসংঘ সনদ হিসেবে পরিচিত। এতে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের জন্য যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের অধীন মানবাধিকার কাউন্সিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের অধীন মানবাধিকার কাউন্সিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃ তথা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুমোদন করে। ওই ঘোষণাপত্রে ৩০টি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে সুষ্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়।

 

এ দেশের সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভূক্ত। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের ওই অধিকারগুলো নিশ্চিত করার। মানবাধিকার হিসেবে গণ্য হওয়ার মতো প্রতিটি বিষয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার। সংবিধানে তৃতীয় অধ্যায়ের ২৭ থেকে ৪৪ নম্বর ধারায় বর্ণিত অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এর কোনো একটি লঙ্ঘিত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে রিট করার মাধ্যমে তার অধিকার নিশ্চিত করতে পারবেন।

 

সারা বিশ্বে এখন মানবাধিকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিটি দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানবাধিকার সংস্থা। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সোচ্চার হয়ে ওঠে ওইসব সংগঠন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা একচোখা মনে হয়। এ অবস্থায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রেরই উদ্যোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের করণীয় দিকগুলো হলো মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ঘোষণা ও দেশীয় আইনগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। জনগণকে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। নাগরিকদের দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তা পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা। সমাজের অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর তথা সংখ্যালঘু, পথশিশু, বস্তিবাসী এমিত, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগণের অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করা। জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানবাধিকার বাস্তবায়নে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগসহ আরো কঠোর আইন প্রণয়ন করা।

 

দেশের নাগরিকদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। মানবাধিকারের ধারণায় কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং হাসপাতালে ঠিকমতো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে কি না, ডাক্তার আছে কি না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ আছে কি না, আমরা দরকারি তথ্যগুলো যথাযথভাবে পাচ্ছি কি না- এগুলোতে নজর রাখতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষে কখনোই মানবাধিকার উপেক্ষা যাবে না। মানবাধিকার নিশ্চিত করাটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিশুরা বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার। রাষ্ট্র ওই অধিকার পূরণে বাধ্য। এ দেশে এখন শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করতে রাষ্ট্রের এগিয়ে আসতে হবে। অধিকারবলে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকাটাই হলো প্রতিটি নাগরিকের চাওয়া। তা পূরণের দায় রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। আইনের দূবল প্রয়োগ কখনোই কারো কাম্য হতে পারে না। খারাপ আইনও সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে সমাজে অনাচার থাকে না। কিন্তু আইন যতো ভালোই হোক, এর প্রয়োগ না হলে তা আরো খারাপ। এতে নাগরিকের মনোবল ক্ষুন্ন করে দেয়।

 

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সময়, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন চুক্তি ও সনদ এবং ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। শান্তি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠন। কিন্তু বাস্তবিকভাবে এ বিষয়গুলো কাগজ-কলমেই থেকে গেছে কিংবা ব্যবহৃত হচ্ছে শক্তিমানদের হাতিয়ার হিসেবে।

 

মানবাধিকারের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হতে হয় রাষ্ট্রকে। আর সেটি শুধু মাত্র নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারে নয়, অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকারে সমৃদ্ধ। এসব অধিকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করে যা যা পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা নিকে হয়। রাষ্ট্রের যারা ক্ষমতায় থাকে তারা যদি অগণতান্ত্রিক হয় তখন মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়ে যায়। সেই জন্য মানবাধিকার সু-প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকা এবং গণতান্ত্রিক সরকার থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরী। আসুন আমরা যারা নিজেদেরকে মানবাধিকার কর্মী বা সংগঠক হিসেবে দাবি করি তারা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার জন্য নিজেদের অবস্থান থেকে সচ্চোর ভূমিকা পালন করি। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা থাকে তারা যদি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় তখন মানবাধিকার রাষ্ট্রের মাধ্যমে সু-প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তখন স্বাধীনভাবে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
ই-মেইল : monzudna@gmail.com

Share this...
Share on FacebookPrint this pageShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn



Skip to toolbar