Search
Sunday 21 January 2018
  • :
  • :

ধরাছোঁয়ার বাইরেই নেপথ্যের কারিগররা, ছোট হচ্ছে ওদের তালিকা, তবে কাটছে না ধোঁয়াশা * এখনো বেশ কয়েকজন ফেরেননি * আশায় বুক বাঁধছেন নিখোঁজদের স্বজনরা

ধরাছোঁয়ার বাইরেই নেপথ্যের কারিগররা,   ছোট হচ্ছে ওদের তালিকা, তবে কাটছে না ধোঁয়াশা * এখনো বেশ কয়েকজন ফেরেননি * আশায় বুক বাঁধছেন নিখোঁজদের স্বজনরা
Spread the love

এশিয়ানপোস্ট ডেস্ক :  একে ফিরে আসছেন কিংবা ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে রহস্যজনক ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের। ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়, সাংবাদিক উৎপল দাস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার ও সবশেষ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এ এস এম আমিনুর রহমান ফিরে এসেছেন। ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে তাদের তালিকা। তবে এসব ব্যক্তির কেউই মুখ খুলছেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এসব রহস্যজনক নিখোঁজ কিংবা অপহরণের কুলকিনারা করতে পারছে না। যে কারণে নেপথ্যের কারিগররা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঢিলেঢালা তদন্তে কাটছে না রহস্য উদ্ঘাটনের ধোঁয়াশা।

তবে এখনো ফিরে আসেননি একইভাবে নিরুদ্দেশ হওয়া বেশ কয়েক ব্যক্তি। এদের মধ্যে সাবেক কূটনীতিক মারুফ জামান, কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাক আহম্মেদ, ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা সৈয়দ সাদাত আহমেদ ও সিরাজুল হক মিন্টু অন্যতম। তবে সম্প্রতি কয়েকজন ফিরে আসায় বাকিদের স্বজনরাও আশায় বুক বাঁধছেন। একইভাবে অক্ষত অবস্থায় তাদের স্বজনরাও শিগগিরই ফিরবেন বলে আশাবাদ তাদের। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তাদের তৎপরতার কারণেই নিখোঁজ ব্যক্তিদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে ফিরে আসছেন। হয়তো পরবর্তী সময়ে অন্যরাও ফিরে আসবে। এদের অনেকে ব্যক্তিগত কোনো কারণেও স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে থাকতে পারেন।

ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হঠাৎ করে এসব রহস্যজনক নিখোঁজ কিংবা অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের নিরুদ্দেশ হওয়া ও ফিরে আসার ‘গল্পটা’ প্রায় একই। মাইক্রোবাসে করে চোখ বেঁধে তুলে নেয়া, দীর্ঘদিন ধরে স্যাঁতসেঁতে টিনের ঘরে আটকে রাখা, সেখানে নিয়মিত খাবার পরিবেশন, এক পর্যায়ে কোনো এক জায়গায় মাইক্রোবাস থেকে চোখ বাঁধা অবস্থায় নামিয়ে দেয়া। অতঃপর পুলিশের সহযোগিতায় বাড়ি ফেরা। এদের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। প্রায় কারো কাছ থেকেই মুক্তিপণ আদায় না করেই মুক্ত করে দেয়া। তবে দু’একটি পরিবারের কাছে দু’একবার সামান্য মুক্তিপণ চাওয়ার কথা শোনা গেছে।

মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এক সমাজে এমন করে কতিপয় মানুষ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া অশনি সংকেত। দেশের ভেতরে কোনো বিশেষ সংঘবদ্ধ ক্রাইম গ্রুপ এ সব অপহরণে জড়িত কি না- তাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। তা ছাড়া কেউ যদি সরকার কিংবা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করতে কিংবা ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা বিশেষ মহলের ইশারায় এসব নিখোঁজের নাটক করে থাকে, তাহলেও নিবিড় তদন্ত করে সেটির নেপথ্যের কাহিনী উদ্ঘাটন করাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব।

গত শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণেই ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিরা ফিরে আসছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও তথ্য মিলেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা রহস্যজনক নিখোঁজ হচ্ছে তারা তো কিছু বলছেন না। ফিরে আসার পর তারা যদি কিছু না বলেন তবে অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফিরে আসা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৪ জন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নেয়ার অভিযোগ স্বজনদের। পরে তাদের নয়জন ফিরে এসেছেন, ছয়জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দু’জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এখনো খোঁজ মেলেনি বাকি ৩৭ জনের।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজদের অপহরণ করার পর চরম ভয় দেখানো হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করলে, ভবিষ্যতে তাদের হত্যা করা হতে পারে। অপহরণকারীদের এমন হুমকির মুখে হদিস মেলা ব্যক্তিরা হয়তো অপহরণের প্রকৃত কারণ প্রকাশ করছেন না। এসব অপহরণ প্রকৃতপক্ষেই অপহরণ নাকি কোনো সাজানো নাটক তাও নিশ্চিত নয়। কারণ অনেকেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে স্বেচ্ছায় অপহরণ বা নিখোঁজের নাটক সাজাতে পারেন।

অন্যদিকে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের তৎপরতার কারণে নিখোঁজরা ফিরছে অথচ অপহরণকারী বা গুমের সঙ্গে জড়িত চক্র গ্রেফতার হচ্ছে না কেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কেন এ চক্রের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছে না। চক্রের সঙ্গে কে বা কারা জড়িত তা বলছে না পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রহস্য উন্মোচন না করায় রহস্যজনক নিখোঁজ বা অপহরণ ভীতি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অপহরণ কিংবা নিখোঁজ ঘটনার দায় সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এড়াতে পারে না। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না বলে এসব বন্ধ হচ্ছে না।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এসব নিখোঁজ বা তুলে নেয়ার ঘটনায় এমন এক চক্র জড়িত, যাদের দক্ষতা, সামর্থ্য ও কৌশল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এমনকি যারা ফিরে আসছেন, তাদের সূত্র ধরে তদন্তের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনীহা। তিনি বলেন, যারা অপহরণের শিকার হচ্ছেন তিনি জানেন এটাই শেষ নয়। তিনি যে আবার নিখোঁজ হবেন না বা অন্য কোনো ধরনের বিপদের মুখোমুখি হবেন না এই নিশ্চয়তা এই মুহূর্তে নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত ছয় মাসে নিখোঁজদের মধ্যে নয়জন স্বজনদের কাছে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে ৮১ দিন নিখোঁজ থাকার পর ১৬ নভেম্বর ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়, ৭০ দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে সাংবাদিক উৎপল দাস ও সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে ৪৪ দিন পর ফেরেন শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায় পরে দাবি করেন, ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষ তাকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিল। অবৈধভাবে তার সম্পত্তি দখলের উদ্দেশেই এটা করা হয়েছে। মোবাশ্বার ও উৎপল বলেছেন, মুক্তিপণের জন্য তাদের অপহরণ করা হয়। তবে কেউ বলছেন না বিস্তারিত কিছু। ফলে তারা ফিরলেও কাটেনি রহস্য।

এর আগে চলতি বছরের ২৩ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের খানা বাসমতি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে নিখোঁজ হন বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংকের কর্পোরেট কমিউনিকেশন্স ও ব্র্যান্ডিং বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদ। ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরণ করা হয় বলে জানান তার স্ত্রী। পরে তারও হদিস মেলে। ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র রুকনুজ্জামান রোকনকে পরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ৫ নভেম্বর রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুর থেকে ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন ও ৭ নভেম্বর খিলগাঁও থেকে ফার্মাসিস্ট জামাল হোসেন নিখোঁজ হন। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় ফিরে আসেন।

এদিকে বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা আশিক ঘোষ অসিতকে ২৭ অক্টোবর সূত্রাপুরের ফরাশগঞ্জ এলাকা থেকে তুলে নেয়া হয়। পরে তাদের গ্রেফতার দেখায় ডিবি। নিখোঁজের ১১ দিন পর ১৯ নভেম্বর রাতে প্রকাশনা ব্যবসায়ী তানভীর ইয়াসিন করিমকে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেফতারের কথা জানায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর গুলশানের শাহজাদপুরে খোঁজ পাওয়ার পর কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এ এম এম আমিনুর রহমানকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২৭ আগস্ট নয়াপল্টন থেকে নিখোঁজ হন তিনি।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) সহেলী ফেরদৌস বলেন, যে বা যারা এখনো নানা কারণে নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এখানে পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদিচ্ছার অভাব নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতার কারণেই সম্প্রতি কয়েকজন ফিরে এসেছেন। বাকিরাও ফিরে আসবেন বলে আমরা আশাবাদী।

এক প্রশ্নের জবাবে এআইজি সহেলী বলেন, যারা ফিরে এসেছেন, তারা যদি পুলিশকে তথ্য দেন, তাহলে জানা যাবে কী কারণে তারা নিজেরা নিখোঁজ হয়েছিলেন কিংবা কে বা কারা তাদের তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এই সহযোগিতাটা পুলিশের জন্য খুবই জরুরি। তাহলেই নেপথ্যের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

মানবকণ্ঠ

Share this...
Share on FacebookPrint this pageShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn



Skip to toolbar