Search
Sunday 21 January 2018
  • :
  • :

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি বিমূর্ত?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি বিমূর্ত?
Spread the love

এশিয়ানপোস্ট ডেস্ক : ২৭ ডসেম্বর ২০১৭

আবু সাঈদ খান : স্বাধীনতার মাস মার্চ বা বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলে সরকার, বিরোধী দল, লেখক, সাংবাদিকসহ আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে সরব হয়ে উঠি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হিসেবে গর্ব করি। আবার একে অন্যকে মুক্তিযুদ্ধের শত্রু বলে গালিও দিই। প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা কতজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি? তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রটি কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চলছে?

এর আগে খতিয়ে দেখা যাক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিমূর্ত কিছু নয়। দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের মাঝে এটি মূর্তমান হয়েছিল। সেই আলোকে ‘৭২-এর সংবিধান রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণ করেছিল। এসব মূলনীতিকে মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলক বলা যায়। তবে জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ কেবল বাঙালির রাষ্ট্র নয়। এ দেশে বাঙালির বাইরে আরও জাতিসত্তার মানুষ আছে। তারাও বাংলাদেশের সমমর্যাদার নাগরিক। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে তাদের অধিকার যে ক্ষুণ্ণ হয়েছে তা অগ্রাহ্য করার জো নেই। আসলে বৃহৎ জাতির প্রটেকশনের দরকার নেই। বরং দরকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সুরক্ষা।

আমাদের জানা, জিয়া-এরশাদের শাসনামলে সংবিধান কাটছাঁট করা হয়েছিল। ওরা সমাজতন্ত্রকে বিকৃত ও ধর্মনিরপেক্ষতা নির্বাসন দিয়েছিল। একাত্তরে পরিত্যক্ত পাকিস্তানি ভাবধারা ফিরিয়ে এনেছিল। অনেক রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়েছিল। রাজাকার শাহ আজিজ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আশাবাদের ব্যাপার, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এসব রাষ্ট্রীয় নীতি আবার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে সংবিধানে ফিরিয়ে আনাই শেষ কথা নয়; সরকার এসব নীতির ধার ধারছে কি-না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংবিধানে বর্ণিত নীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতি হবে পরিকল্পিত এবং সমাজতন্ত্র অভিমুখী। মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে আনা হবে। কমিয়ে আনা হবে শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য। সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্র উদ্যোগী ভূমিকা নেবে। যারা পিছিয়ে পড়েছে, তাদের এগিয়ে দেবে। বাস্তবে কী ঘটছে? মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। কিন্তু মানুষে মানুষে বৈষম্য কমছে না বরং বাড়ছে। ওপরের ১০ শতাংশ লোকের সঙ্গে তলানির ১০ শতাংশ লোকের বিস্তর তফাত। রাষ্ট্র নির্বিকার। যেসব নীতি ও পদক্ষেপ নিচ্ছে তাতে বৈষম্য বাড়তে থাকবে। এখন আবার মুক্তবাজার অর্থনীতি। এই প্রতিযোগিতায় ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব হচ্ছে অধিকারহারা। এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। বলা হয়, সারা দুনিয়া যেভাবে চলছে, বাংলাদেশও সেভাবে চলবে। সারা দুনিয়া কিন্তু একইভাবে চলছে না। ইউরোপের দেশগুলোও বৈষম্য অবসানে সোচ্চার। ফ্রান্সের জনগণ পরিবর্তনকামী ইমানুয়েল মাক্রোনকে জিতিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্যান্ডার্স ও যুক্তরাজ্যের করবিনের জনপ্রিয়তার মূলে মুক্তবাজারের আগ্রাসন থেকে গণমানুষের মুক্তির আকুতি। নেপালে এখন লাল ঝাণ্ডার জয়জয়কার। তাই পুঁজিবাদ শেষ কথা- এমন ভাবার সুযোগ নেই। তার চেয়ে বড় কথা- বাংলাদেশ চলবে তার নিজস্ব পথে। যে পথ দেখিয়েছে একাত্তর, যে পথ বাহাত্তরের সংবিধানে স্বীকৃত। সে পথ থেকে সরে যাওয়া ৩০ লাখ শহীদের প্রতি অবমাননা বৈ অন্য কিছু নয়।

গণতন্ত্র অন্যতম রাষ্ট্রীয় নীতি। তবে দেশে গণতন্ত্র বলতে যেটি চালু আছে, সেটি ভোটতন্ত্র বা ইলেকট্রোক্রেসি। ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলের পর নির্বাচন প্রক্রিয়া এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের জন্য বিএনপি আওয়ামী লীগকে দায়ী করছে। আওয়ামী লীগ আবার বিএনপির নির্বাচন বর্জনকে দায়ী করছে। এই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, ওই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান জরুরি। আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- এবার আর একটি বিতর্কিত নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের রাস্তা আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে; যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথেও বাধা। সামনে এগোতে হলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন করতে হবে। আর গণতন্ত্রকে কেবল ভোটতন্ত্রে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজনৈতিক দল, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। যদি রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র না থাকে, নির্বাচন না থাকে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে না ওঠে, তা হলে পার্লামেন্ট নির্বাচন বা পার্লামেন্টে গণতন্ত্র চর্চা কি আদৌ সম্ভব?

বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের ছাত্র সংসদকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার যে ক্ষেত্র ছিল, তা আজ বন্ধ। ডাকসু, রাকসু, চাকসু, ইকসুসহ কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজ নির্বাচন হয় না। স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে নির্বাচন হয়েছে। অথচ গণতন্ত্রের দাবিদার সরকারগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচনের থোড়াই কেয়ার করছে। এটিও গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় একটি বাধা।

তবে ভোটের গণতন্ত্র শেষ কথা নয়। ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ভাতের গণতন্ত্র, কাজের গণতন্ত্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের গণতন্ত্র অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যখন অর্থনীতিতে গণতন্ত্র নেই, সেখানে ভোটের গণতন্ত্র কোনো ফল বয়ে আনবে না। গণতন্ত্র হচ্ছে একটি ব্যবস্থা, যা জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত। ইদানীং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলা হচ্ছে। অর্থনীতিতে গণতন্ত্র ছাড়া তা সম্ভব নয়। কোটিপতিদের টাকার খেলার কাছে একজন সৎ বিত্তহীন প্রার্থীর প্রতিযোগিতা অসম্ভব। আমরা ভোট ও ভাতের উভয় ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চাই। একটি আরেকটির পরিপূরক।

সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে ধর্মনিরপেক্ষতা। এটি যেন সংবিধানের অলঙ্কার। এরশাদের সংযোজিত রাষ্ট্রধর্ম এখনও বহাল আছে। সর্বোচ্চ আদালতের ‘৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের রায়ে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম, হয়তো একাত্তরের চেতনাবিরোধী রাষ্ট্রধর্ম অপসারিত হবে। কিন্তু হলো না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে তা পুনর্বহাল করা হলো। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, রাষ্ট্রধর্মের সমর্থকরা বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র বলছে। আর প্রগতিবাদীদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এমন জগাখিচুড়িতে সংবিধানের মৌলিক চেতনা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। কেবল সংবিধানে নয়, বাস্তবেও একাত্তরের পরিত্যক্ত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শিকড় গেড়েছে। সাম্প্রদায়িকতাও ডালপালা মেলেছে। বলাই বাহুল্য, পাকিস্তান সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ছিল, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ছিল। তখন সরকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাত। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল জীবন বাজি রেখে তা মোকাবেলা করত। আর আজ ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িকতার দাবিদার দলগুলোর কর্মীরা সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা মোকাবেলা করে না। উপরন্তু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা সংঘটনে তৎপর হয়।

আমাদের জানা, বিএনপি-জামায়াতের সখ্যের পেছনে কোনো আদর্শিক কারণ নেই। আর ক্ষমতাসীন দলে জামায়াতের ক্যাডারদের বরণ করে নেওয়ার ঘটনাও অগ্রহণযোগ্য। জামায়াত ঠেকাতে হেফাজতের সঙ্গে দোস্তিপনাও আমাদের বোধগম্য নয়। হেফাজতের মনোরঞ্জনে কওমি মাদ্রাসার সংস্কারের প্রস্তাব কেবল শিকেয় তোলা হয়নি। বলা হয়েছে, তারা যাহা পড়াবেন, তাহাই সহি। সরকার কোনোরূপ মনিটরিং করবে না। কেবল সরকার মাদ্রাসা প্রদত্ত সনদের স্বীকৃতি দেবে। ব্যাপারটা এখানেই থেমে নেই। হেফাজতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সাধারণ পাঠক্রমেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘হিন্দু’ ও প্রগতিশীলদের লেখা বাদ দেওয়া হয়েছে। এই তোষণ নীতি যে কূপমণ্ডূক সমাজের গোড়াপত্তন করছে, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

এটি বোধগম্য যে, ধর্মের প্রতি নূ্যনতম শ্রদ্ধাশীল নয়, এমন মানুষ যেমন ক্ষমতার স্বার্থে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করছে; ঠিক তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। এটি মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল স্লোগান বা বুলি নয়, এটি আদর্শ; যা ধারণ করতে হবে, লালন করতে হবে। সেই আলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। গড়তে হবে সব মানুষের বাসযোগ্য বাংলাদেশ; সেখানে ধর্ম-বর্ণে বিভাজন থাকবে না, শোষণ-বঞ্চনা থাকবে না। থাকবে স্বাধীনভাবে পথ চলার, কথা বলার, প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার। সেটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

ask_bangla71@yahoo.com

Share this...
Share on FacebookPrint this pageShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn



Skip to toolbar