বছরজুড়ে বিরূপ প্রকৃতি, সামনেও বিপদের ভয়

বছরজুড়ে বিরূপ প্রকৃতি, সামনেও বিপদের ভয়
Spread the love

এশিয়ানপোস্ট ডেস্ক :  ভরা পৌষে এখনো হাড় কাঁপানো শীতের দেখা মিলছে না। অগ্রহায়ণেই হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি; জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘বিরল বর্ষণ’।

চলতি বছর জুনে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড়ধসে মারা যায় ১৬০ জন। এর আগের রেকর্ড ২০০৭ সালের। ওই বছর পাহাড়ধসে মারা যায় ১২৭ জন। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে ঝুঁকি কমেনি, ঝুঁকি কমানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। রাঙামাটি, চট্টগ্রামসহ পার্বত্য জেলায় পাহাড়ের পাদদেশে থেমে নেই নতুন নতুন ঘর নির্মাণ। আর ঘর নির্মাণে পেছন থেকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। আসছে বর্ষায় আবারও পাহাড়ধস হলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। হাওরাঞ্চলে বন্যার পর নেওয়া কর্মসূচি নিয়েও কথা উঠছে। বাঁধ নির্মাণ কাজেও দুঃসংবাদ রয়েছে। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জে হাওরে এখনো বাঁধ নির্মাণের কাজই শুরু হয়নি। তা ছাড়া কিশোরগঞ্জের মিঠামইন, অষ্টগ্রামসহ অনেক হাওর থেকে এখনো সরেনি পানি। এতে করে বীজতলা বসাতে পারছে না কৃষক। এবারও দেরি করে ক্ষেতে চারা বসাতে হবে। আর বোরো ধান আসবে দেরি করে। এবার যদি হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা হয়, তাহলে আবারও বানের পানিতে ধুয়েমুছে যাবে কৃষকের ফসল।

এদিকে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সারা দেশে যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তার কারণে শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ বছর শীতকালীন সবজি উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেটি অর্জিত হবে না বলেও অভিমত জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের। একই সঙ্গে এবারের অসময়ে বৃষ্টির কারণে আমন ধানেরও ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত কালের কণ্ঠকে বলেন, খনার বচনে বলা আছে, ‘যদি বরষে আগুনে; রাজা যায় মাগনে। ’ অর্থাৎ অগ্রহায়ণে যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে রাজার ভিক্ষাবৃত্তির দশা হয়। এবারের অগ্রহায়ণে যে বৃষ্টি হয়েছে, তাতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

চলতি বছর জুনে পাহাড়ধসের পর সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, অবৈধভাবে যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে, তাদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র পুনর্বাসন করে দেওয়া হবে। পাহাড়ে নতুন করে ঘর নির্মাণ না করার কথা বলা হয়েছিল। ন্যাড়া পাহাড়ে গাছ লাগানোর ঘোষণা ছিল সরকারের। এ ছাড়া গাছ কাটা বন্ধ, পাহাড় থেকে মাটি কাটা বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিল সরকার। একই সঙ্গে পাহাড় থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, গত ছয় মাসে মাঠপর্যায়ে কোনো কাজই হয়নি। এখনো ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে দরিদ্র মানুষজন। চট্টগ্রামের আকবরশাহ থানা, খুলশি থানা ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার আওতায় পাহাড়গুলোতে চলছে নতুন নতুন ঘর নির্মাণ। ওই সব পাহাড়ে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করছে, তাদের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তারা পাহাড়ের নিচে বসবাস করছে। পাহাড়ে বনায়নও করা হয়নি। চলছে সরকারি সংস্থার রাস্তা নির্মাণের কাজও। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যে ১২টি সুপারিশ করা হয়েছিল, মাঠপর্যায়ে তার একটির বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। অবশ্য শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে পাহাড়ধস ঠেকাতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেসব এখনো কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। স্থানীয়রা একে বলছে ‘কাগুজে প্রস্তুতি’।

তবে দুর্যোগসচিব শাহ কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, পাহাড়ধসের পর অনেক অগ্রগতি হয়েছে। জাতীয় কমিটি এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার পার্বত্য জেলায় গিয়ে সবার সঙ্গে বৈঠক করেছে। যারা পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে, তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তারা আবার নতুন করে সেখানে আশ্রয় নিচ্ছে। এ ছাড়া বনায়নের জন্য বন বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যে ১২টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেন দুর্যোগসচিব। এ প্রসঙ্গে বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আমরা একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছি। ওই প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ে বনায়ন করা হবে। তবে পাহাড়ধস ঠেকাতে হলে পাহাড় থেকে মাটি কাটা বন্ধ করতে হবে। অবৈধভাবে যারা বসবাস করছে, তাদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের মধ্যে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ’

ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশেষণ করে দেখা গেছে, বিদায়ী বছরে পাহাড়ধসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে সারা দেশে প্রাণ গেছে ৫৭০ জনের। এর মধ্যে বজ্রপাতে মারা গেছে ২৫০ জন; জুলাই ও আগস্টে ৩২ জেলায় বন্যায় প্রাণ গেছে ১৫০ জনের। ঘূর্ণিঝড় মোরায় দেশের বিভিন্ন জেলায় মারা গেছে আটজন। আর বছরের শুরুতে ভূমিকম্পে মারা গেছে দুজন।

হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার পর সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী ফসল না আসা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি পরিবারে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। যতটুকু দেওয়া হয়েছে, তা ছিল অপর্যাপ্ত। অবশ্য এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে দুর্যোগসচিব জানালেন, এই সহায়তা একবারের জন্যও বন্ধ হয়নি। তবে কিছুদিন দেরি হতে পারে। হাওরে আগাম বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করার ঘোষণা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি বাঁধ নির্মাণের কাজ। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ অন্য জেলাতেও একই চিত্র। সুরমা, কুশিয়ারা নদী খনন করে পলিমাটি সরানোর দাবি ছিল কৃষকদের। কিন্তু সেই দাবি পূরণ হয়নি আজও। নদী খননের কাজ এখনো শুরু হয়নি। পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নদী খননের। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আগামী বছর যদি আবার আগাম পানির ঢল আসে, তাহলে আবারও ফসলহানির ঘটনা ঘটতে পারে। বজ্রপাত থেকে রক্ষায় এ বছর থেকে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

জুন ও জুলাই মাসে দ্বিতীয় দফায় দেশের ৩২ জেলায় দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। সিপিডি বলছে, ওই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তাদের গবেষণা মতে, দ্বিতীয় দফা বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩৫ থেকে ০.৪৪ শতাংশের সমান। চলতি বছরে এই পরিমাণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। ৩২ জেলায় বন্যার পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত ও নির্মাণ, রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধ মেরামত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরামত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। কিন্তু কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জেলার তথ্য বলছে, সেই প্রতিশ্রুতির সিকি ভাগও বাস্তবায়ন হয়নি। কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী, চিলমারী উপজেলায় দরিদ্র পরিবারগুলো এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তাদের ঘরবাড়ি এখনো বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এখনো ক্ষতিগ্রস্ত সেতু সংস্কার করা হয়নি। রাস্তাঘাটও চলাচলের অনুপযোগী। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীন ও জাপান। সেই প্রতিশ্রুতিও এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ডিসেম্বরের ৯ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত নিম্নচাপের কারণে সারা দেশে যে বৃষ্টি হয়েছিল, সেই পানি এখনো নামেনি। ফলে হাওরাঞ্চলে এখনো বোরো ধানের চারা লাগানো যায়নি। ফলে এ বছরও দেরি হবে বোরো ধান আসতে।

চলতি বছর এপ্রিলে হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় আগাম বন্যার পর কৃষকদের সহযোগিতা করতে বিভিন্ন এনজিও থেকে নানা ধরনের তৎপরতা দেখা দেয়। কিন্তু প্রথম কয়েক দিন কাজ করার পর ফিরে আসে এনজিওগুলো। এখন আর এনজিওগুলোর দেখা মিলছে না। কৃষিঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধের দাবি ছিল কৃষকদের এবং দুর্যোগের সময় কৃষকদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি না তোলার দাবিও ছিল। কিন্তু এসব দাবি বাস্তবায়ন করা হয়নি। হাওর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ কৃষকদের দাবি ছিল জলমহালের ইজারা বাতিল করার। একই সঙ্গে উন্মুক্ত নদী ও জলমহালে অবাধে মাছ ধরার দাবি উঠেছিল হাওরাঞ্চলে। কিন্তু সেই দাবিও পূরণ করা হয়নি।

এনজিওগুলোর সমালোচনা করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত বলেন, গত এপ্রিলে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার কারণে বোরো ধানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এনজিওগুলো প্রথম কয়েক দিন থেকে সেখান থেকে চলে এসেছে। রোহিঙ্গা নিয়েও একই অবস্থা। প্রান্তিকে কেউ যেতে চায় না। রাস্তা যেখান পর্যন্ত ভালো, এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ড সেখান পর্যন্তই। একদম তৃণমূলে কেউ যেতে চায় না। বিষয়টি দুঃখজনক। আর বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. আসাদুজ্জামানের মতে, আগাম দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি নেই। সে কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বপরিমণ্ডলে ২০১৭ সালকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বছর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় সব মহাদেশই আক্রান্ত হয়েছে ঘূর্ণিঝড়, দাবানল ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে। সুইস বীমা কম্পানি সুইস রে পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে, সারা বিশ্বে বছরজুড়ে ঘটে যাওয়া দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩১০ বিলিয়ন ডলারের মতো। ২০১৬ সালের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ ৬৩ শতাংশ বেশি বলেও দাবি করেছে সুইস রে। কম্পানিটি বলছে, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে একদিকে যেমন প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে, একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে আক্রান্ত দেশগুলো। কালেরকণ্ঠ

Share this...
Share on FacebookPrint this pageShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn



Skip to toolbar