Search
Wednesday 17 January 2018
  • :
  • :

অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে ভোগান্তি কমছে না

অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে ভোগান্তি কমছে না
Spread the love

এশিয়ানপোস্ট ডেস্ক :  যশোরের চৌগাছার গৌতম মজুমদার অর্পিত সম্পত্তিসংক্রান্ত ঝামেলা পোহাচ্ছেন ১৯৯৫ সাল থেকে। প্রথম দিকে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘুরে ঘুরে তাঁর সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন।

পরে ২০১৩ সালে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে নিজের পক্ষে রায় পান। কিন্তু সরকার আপিল করে। আপিলেও নিজের পক্ষে রায় পান গৌতম। এরপর তিনি সেই সম্পত্তি তাঁর নামে নামজারি করে দিতে ডিসির কাছে আবেদন করেন। কিন্তু এখনো নামজারি হয়নি বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন গৌতম মজুমদার।

ট্রাইব্যুনাল ও আপিল শেষে নামজারি হলেও হয়রানি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না হবিগঞ্জের বাহুবলের অভিজিৎ ভট্টাচার্য। তিনি নামজারি করে খাজনা পরিশোধ করলেও নতুন একটি পক্ষ হাইকোর্টে রিট করে জমির মালিকানা দাবি করেছে।

অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে এভাবে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাচ্ছে কয়েক কোটি মানুষ। অর্পিত সম্পত্তিসংক্রান্ত ঝামেলা মেটাতে সরকার কয়েক দফা সময় বাড়ালেও সমস্যার সমাধান হয়নি।

বরং নতুন নতুন সমস্যা সামনে হাজির হয়েছে। এ অবস্থায় ‘ক’ তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির (সরকারের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ) সব মামলা ২০১৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। গত ৪ ডিসেম্বর এসংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে সব ডিসি ও জেলা জজ বরাবর।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬১টি (তিন পার্বত্য জেলা বাদে) জেলায় ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি দুই লাখ ২০ হাজার একরের কিছু বেশি। এর মধ্যে এক লাখ ১০ হাজার একর জমি নিয়ে মামলা হয়েছে। বর্তমানে মামলার সংখ্যা এক লাখ ১৯ হাজার ৩০০। ২০১৩ সালে এসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাত্র ১৫ হাজার ২২৪টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ১৩ শতাংশেরও কম। এই অবস্থায় আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অবশিষ্ট ৮৭ শতাংশ মামলা কোনোভাবেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন খোদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চূড়ান্তভাবে জমি ফেরত পেয়েছেন এমন ঘটনা খুবই কম। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সব মামলা নিষ্পত্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় জেনেও এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়ায় সরকারি নির্দেশনার কার্যকারিতা নষ্ট হয়। ’

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা, ট্রাইব্যুনালে বিচারকস্বল্পতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় লাগছে; যদিও সরকার মামলা নিষ্পত্তি করতে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার পরও এসব মামলা শেষ হচ্ছে না।

ভূমিসচিব মো. আব্দুল জলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। না হলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

অর্পিত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা নানা বিতর্ক সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব সিদ্ধান্তে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেমন নাখোশ, তেমনি  যাদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা হচ্ছে তারাও নাখোশ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। সরকারের দখলে আছে কিন্তু ‘ক’ তালিকায় ওঠেনি এমন সম্পত্তির পরিমাণ আট হাজার একর। আর তালিকায় ভুলভাবে উল্লেখ রয়েছে ১৪ হাজার একর জমি। ভুলভাবে উল্লেখ রয়েছে বলতে জমির দাগ নম্বর, মালিকের নাম—এসব বিষয়ে তথ্যগত ভুলকে বোঝানো হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এসব সংশোধন করার উদ্যোগ নিলেও তাতে সাড়া দেয়নি মন্ত্রিসভা। তালিকা সংশোধন করতে গেলে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানুষকে নতুন করে হয়রানিতে ফেলবেন—এমন আশঙ্কায় তালিকা যেভাবে রয়েছে সেভাবেই রাখতে চাইছে সরকার।

‘খ’ তালিকার সম্পত্তি নিয়ে হয়রানি : অর্পিত সম্পত্তির ‘খ’ তফসিল (ব্যক্তির দখলে) বাতিল করা হলেও এ নিয়ে এখনো হয়রানি হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আইন সংশোধন করে ‘খ’ তালিকা বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ‘খ’ তালিকার জমি নামজারি করতে গেলে অনেক কর্মকর্তাই আপত্তি জানাচ্ছেন। তাঁরা নামজারি করতে আইনি সুরক্ষা চান। এই সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আইন সংশোধন করতে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে সেখান থেকে তা ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার প্রকৃত মালিকদের কাছে অর্পিত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে চাইলেও তাতে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। আইনটি দফায় দফায় সংশোধনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মন্ত্রিসভার সদস্যরা একমত হতে না পারায় তা ছয়বার মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকে ফেরত পাঠানো হয়। মন্ত্রিসভা সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর তা ফেরত পাঠায়।

এ বিষয়ে ভূমিসচিব বলেন, মন্ত্রিসভা থেকে ফেরত আসার পর আইনটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সময়মতো তা আবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, অর্পিত সম্পত্তি সরকারের সম্পত্তি নয়। এগুলো সরকার তদারক করছে মাত্র। একসময় অর্পিত সম্পত্তির নাম ছিল শত্রু সম্পত্তি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় যারা সহায়সম্পদ ফেলে জীবন নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছিল তখনকার সরকার। পরে এর নাম দেওয়া হয় অর্পিত সম্পত্তি। বর্তমান সরকার এসব সম্পত্তি প্রকৃত উত্তরাধিকারীর কাছে ফেরত দিতে চায়। কিন্তু এর প্রক্রিয়াটি মসৃণ নয়। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। তাঁদের হটিয়ে প্রকৃত মালিককে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে তাঁরা বাধা সৃষ্টি করছেন। একইভাবে সরকারের ভূমি অফিসের কর্মচারীরাও এসব কাজে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। অর্পিত সম্পত্তি প্রকৃত উত্তরাধিকারীকে ফেরত দিতে ২০০১ সালে আইন করে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু সে বছরই বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর সেই সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার আবার ক্ষমতায় আসার পর অর্পিত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার আইন নতুন করে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।কালেরকণ্ঠ

Share this...
Share on FacebookPrint this pageShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn



Skip to toolbar