উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ

উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ
Spread the love

গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প মনিটরিং টাস্ক ফোর্সের সভায় এসব প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, একমাত্র সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়া সবগুলো প্রকল্পের কাজে সন্তোষজনক অগতি হয়েছে। ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প তদারকি টাস্কফোর্সের সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব কাজী শফিকুল আযম বলেন, এখন পর্যন্ত এসব প্রকল্পের কাজের যে অগ্রগতি হয়েছে তা সন্তোষজনক। আগামী বছরের মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সেতুর কাজ শেষ হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলছেন, কাজ শেষ হতে আরও কয়েকমাস লাগবে। তিনি বলেন, সেতুর কাজ পুরোদমে চলছে। ভ‚মি কাঠামোর কারণে ১৪টি ‘পিলার’ বসানো নিয়ে নকশায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পদ্মা সেতুর ৫০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত বুধবার সিরাজদিখান উপজেলার মস্তফাগঞ্জ সেতু উদ্বোধন শেষে তিনি বলেন, মূল সেতুর কাজ অনেক এগিয়ে গেছে। পদ্মা নদী দক্ষিণ আমেরিকার আমাজানের মতো একটি নদী, একবারে অনিশ্চিত একটি নদী। নির্দিষ্ট তারিখ দিয়েও আমরা সেই নির্ধারিত সময় রাখতে পারি না। ২য় স্প্যান বসতে আমাদের আরো একটু সময় লাগবে। তিনি আরও জানান, পদ্মার পানির নিচে এতো বেশি অনিশ্চিত পরিস্থিতি যেখানে গভীরতা মিলিয়ে টেকনিক্যাল কিছু সমস্যা আছে। আমাদের টার্গেট আমরা যথাসময়েই শেষ করব। একটি-দুইটি স্প্যান বসার পর সাত-আট দিন পর আরও ৩৯টি স্প্যান বসতে পারবে। কাজেই যথাসময়ে কাজ শেষ হওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।
পরিকল্পনা কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ স্থাপন, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্পসহ যে ১০টি প্রকল্পকে ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগেরই কাজ শেষ করতে চায় সরকার। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা ও যানজট নিরসনে যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে সেগুলোও ২০১৮ সালের মধ্যেই শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে এসব কাজ নির্বাচনের অন্তত ছয় মাস আগেই শেষ করার তাগিদ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পরিকল্পনা কমিশন। তবে সরকার এ সময়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখছে বৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষের যেন ভোগান্তি কম হয় এ কথা মাথায় রেখেই সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সূত্র মতে, সরকার জনগনকে আগামী নির্বাচনের আগেই ভোটের জন্য উন্নয়নের মহাকর্মকান্ড দেখাতে চায়। তাই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য পদ্মা সেতুটি খুলে দিতে চায় সরকার। এই সেতুকে ঘিরে আরেকটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। তা হলো পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ স্থাপন। সেতুতে যেদিন থেকে যান চলবে সেদিন থেকেই রেলও চলবে। এই লক্ষ্যেই কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া ঢাকাবাসীকে স্বস্তি দিতে মেট্রোরেলের অন্তত প্রথম অংশ উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের কাজ শেষ করতে চায় সরকার। পাশাপাশি বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালি পর্যন্ত নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর-বনানী অংশও নির্বাচনের আগেই চালু করার চেষ্টায় আছে সরকার। এ লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে চলছে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ।
পদ্মা সেতু
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পদ্মা সেতু নির্মাণ। সরকারের মেয়াদ শেষে ভোটের আগে নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে আলোচিত অবকাঠামো পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের কাজ শেষ করাটা সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দুটি পিলারের উপর একটি স্প্যান বসিয়ে সেতুর অবকাঠামো দৃশ্যমান করা হলেও নির্ধারিত সময় ২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এ প্রকল্পের ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মূল সেতুর কাজে অগ্রগতি হয়েছে ৫২ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় নদী শাসনের কাজে ৩৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সেতুর জাজিরা সংযোগ সড়কের ৯৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ স্থাপন প্রকল্পের কাজ। অন্তত সেতুর মূল অংশে রেল চলবেই একই দিনে। অর্থাৎ যেদিন এ সেতুতে গাড়ি চলবে, সেদিন রেলও চলবে। তবে এই সেতুর দুই প্রান্তের রেল লাইনের কাজে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে বলে জানা গেছে।
সেতুর কাজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় আট মাস পিছিয়ে আছে বলে গেল মাসে আইএমইডির তৈরি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নদী শাসনের কাজ ৩৪ ভাগের বেশি শেষ হলেও এই সময়ে কাজের ৫৬ শতাংশ অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ সেতুর কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। কাজে গতি আনতে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়েই প্রকল্প সমাপ্ত হবে। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
মেট্রোরেল
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন মডেল বাস্তাবায়নে আরেকটি চ্যালেঞ্জ মেট্রোরেল। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যা প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের কাজও চলছে বিরামহীন দিনরাত ২৪ ঘণ্টা। আগামী বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ গুছিয়ে আনতে চায় সরকার। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে প্রকল্পটির একাংশ উদ্বোধন করা যায় কিনা সে চিন্তা করছে সরকার। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ হবে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। প্রকল্পর শুরু থেকে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২ হাজার ১৬২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত লাইন স্থাপন করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক, মতিঝিল পর্যন্ত লাইন স্থাপন করা হবে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
হযরত শাহজালাল অন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত উড়াল সড়ক নির্মাণের কথা। এর অনেক পরে নেওয়া প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। কিন্তু এ প্রকল্পের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। পিপিপির আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি ২০১১ সালে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইতাল-থাইয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। একই বছরে হয় ভিত্তি স্থাপন। এরপর পেরিয়ে গেছে ৬ বছর। অগ্রগতি মাত্র ৯ শতাংশ।
জমি অধিগ্রহণে জটিলতা আর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সময়মতো অর্থ জোগাড় করতে না পারায় দীর্ঘদিন আটকে ছিল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ। গত বছরের ৬ জুলাই ইতাল-থাইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় সিনো হাইড্রো। এ নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, ইতাল থাই ও সিনোহাইড্রো যৌথভাবে এখন নিশ্চয়তা দিয়েছে, প্রকল্পে অর্থছাড় করতে সমস্যা হবে না। পুরোদমে কাজ চলবে।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দফায় দফায় সময় পেছানোর পর সর্বশেষ ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সরকার। তবে এ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে সংশয়।
প্রকল্প পরিচালক কাজী মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, সরকার ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। তবে এতদিন মাটির নিচের কাজ বেশি হওয়ায় দৃশ্যমান হয়নি।
কর্ণফুলী টানেল
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে দেশে প্রথমবারের মতো টানেল নির্মাণের কথা। ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেলের পূর্ব প্রান্তে ৫ কিলোমিটার এবং পশ্চিম প্রান্তে ১ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে টানেলের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। ঋণচুক্তির এক বছর পর সম্প্রতি অর্থছাড় করেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।
সময়মতো নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টানেল নির্মাণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এতে ২ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা দেবে চীন।
কক্সবাজার-দোহাজারি রেলপথ
বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের জন্য ১২৫ বছর আগে চিন্তা করেছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু এখনো এর বাস্তবায়ন নেই। নভেম্বরে কাজ শুরুর কথা থাকলেও শুরু হয়নি প্রকল্পের নির্মাণকাজ। তাই ২০১৮ সালের মধ্যে রেলপথটি দৃশ্যমান হচ্ছে না তা সহজেই অনুমেয়। গত অক্টোবর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিসই হয়েছে। সিআরইসি ও সিসিইসিসি নামে দুটি চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে মোট ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, কক্সবাজার-দোহাজারি রেলপথ ছাড়াও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত ১০টি প্রকল্পের কাজে আগামী বছর দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে চায় সরকার। এ ছাড়া সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট সংস্কার করা হবে। চরাঞ্চল, নদী ভাঙন এলাকা ও এ বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এসব এলাকায় নতুন কিছু ব্রিজ ও কালভার্ট ও বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তার জন্য পুরনো বাঁধের সংস্কারের পাশাপাশি নতুন নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে চলতি বছর বলে সরকারের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

Share this...
Share on FacebookPrint this pageShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn



Skip to toolbar